আরসিসিআই পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর : শিক্ষা, আদর্শ ও উৎকর্ষতার এক গৌরবময় অভিযাত্রা
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরসিসিআই পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক সংগঠন রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (RCCI)-এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই মানসম্মত, আধুনিক ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। ব্যবসা ও শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দূরদর্শী চিন্তা থেকেই এর জন্ম।প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট
১৯৯৫ সালে তৎকালীন রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি, বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য রহিম উদ্দিন ভরসা-এর নেতৃত্বে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রতিষ্ঠানের সূচনার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) টাকা অনুদান প্রদান করেন, যা ছিল এই মহৎ উদ্যোগের প্রথম তহবিল।১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে রংপুর শহরের সেন্ট্রাল রোডে অবস্থিত 'দরদী বিল্ডিং'-এর একটি ভাড়া করা ভবনে নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ গোলাম মোস্তফা, এবং প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল হক। শুরু থেকেই দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে একটি আদর্শ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগটি কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল না; বরং ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের একটি সুদূরপ্রসারী প্রয়াস ছিল। মানসম্মত ও আদর্শ শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এই উদ্যোগ গ্রহণ করে।স্থায়ী ক্যাম্পাসে অগ্রযাত্রা
প্রতিষ্ঠালগ্নেই নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে রংপুর চেম্বার কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে পূর্ব শালবন, বেগম রোকেয়া সরণি এলাকায় প্রায় ৮৭ শতক জমি প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৯৬ সালেই এই নিজস্ব জমিতে বাংলাদেশ শিল্প ও বাণিজ্য মহলের অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং তৎকালীন এফবিসিসিআই (FBCCI)-এর সভাপতি সালমান এফ. রহমান নতুন স্থায়ী ক্যাম্পাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।পরবর্তীকালে এই ক্যাম্পাসে নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন পাঁচতলা একাডেমিক ভবন। এই ভবন নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে রংপুর অঞ্চলের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সমাজসেবী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দাতা ব্যক্তি ও সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অবদানকারীদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট সমাজসেবী, শিল্পপতি ও দাতা আলহাজ মোতাহার হোসেন চৌধুরী, EXIM Bank, বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন, FBCCI-এর প্রধান নেতৃবৃন্দ এবং Rotarians। তাঁদের সহযোগিতা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শহরের কোলাহল ও ব্যস্ততা থেকে মুক্ত, মনোরম পরিবেশে প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসটি গড়ে ওঠায় শুরু থেকেই এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শান্ত, নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে আসছে।একাডেমিক স্বীকৃতি ও সম্প্রসারণ
প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে সরকারি অনুমোদন লাভ করে—
এরপর প্রতিষ্ঠানটি "আরসিসিআই পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর" নামে পূর্ণাঙ্গ স্কুল ও কলেজে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে মাধ্যমিক বিভাগ ২০১০ সালে এবং উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ ২০১৯ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে নার্সারি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।শিক্ষা ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা
২০০৩ সালে প্রথম এসএসসি এবং ২০০৫ সালে প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নতুন মাইলফলক স্পর্শ করে। শুরু থেকেই পরীক্ষার ফলাফলে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আস্থার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বহু বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে অত্যন্ত উচ্চ পাসের হার বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার মানের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশেষভাবে ২০০৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ সাফল্যের জন্য রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থান অর্জন করে।নেতৃত্ব ও উন্নয়নের ধারা
প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক উন্নয়নে বিভিন্ন সময় রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একইভাবে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষসহ পরবর্তী অধ্যক্ষগণ শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণে বিশেষ অবদান রেখেছেন।বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী সভাপতিগণ তাঁদের নিজ নিজ মেয়াদে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মুক্তিযোদ্ধা মোসাদ্দেক হোসেন বাবলু, মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, এ. টি. এম. শাহনেওয়াজ বাবলু, মো. আবুল কাশেম, মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু এবং মো. আকবর আলী।প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ও প্রশাসনিক বিকাশে সাবেক অধ্যক্ষগণের অবদানও বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল হক-এর পর দায়িত্ব পালনকারী অধ্যক্ষদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ আবদুল জলিল, কে. এম. হাসিনুর রহমান এবং মাসুদ আহমেদ হায়দার। তাঁরা নিজ নিজ সময়ে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার গুণগত মান, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সামগ্রিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপারসন মো. এমদাদুল হোসেন, যিনি একই সঙ্গে রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, রংপুর-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।আধুনিক শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের বিকাশ
একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, বিজ্ঞানমনস্কতা, নেতৃত্বগুণ এবং সৃজনশীলতা বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে। জাতীয় দিবস পালন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে নার্সারি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২,১০০ জন শিক্ষার্থী, ৬৭ জন শিক্ষক এবং ৩৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানে মোট ৭৫টি কক্ষ রয়েছে।শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানে সমৃদ্ধ পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও ICT ল্যাবরেটরি, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ এবং একটি সুসজ্জিত ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার রয়েছে।শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে প্রতিষ্ঠানে পরিবহন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য CCTV ক্যামেরার পাশাপাশি ম্যানুয়াল নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও বিদ্যমান।প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে বিভিন্ন সময় বৃত্তি ও শিক্ষাসহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষভাবে রংপুর চেম্বার অব কমার্স, একটি জাপানি সংস্থার বৃত্তি এবং বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের বৃত্তি প্রতিষ্ঠানের বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে। এসব বৃত্তি ও সহায়তা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।সমাজ ও জাতি গঠনে অবদান
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আরসিসিআই পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং দক্ষ, মানবিক, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে অবদান রেখে চলেছেন।শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং ভবিষ্যতেও জাতীয় উন্নয়ন ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে—এটাই আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা।